ঢাকা, রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১

করোনা পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হওয়ার গল্প

অনলাইন ডেস্ক

২০২০-১১-২০ ১৮:১৫:৩৪ /


গত ৩ নভেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার রাত ১২টার পর হঠাৎ করে শরীরে প্রচন্ড শীত অনুভব করি।ভাবলাম হঠাৎ করে শীত পড়েছে তাই এত শীত লাগছে।কাঁথার সাথে কম্বল নিয়ে শুয়ে থাকি তারপরেও শীত কমছিলনা।কিছুক্ষণ পর শুরু হয় শরীর ও মাথা ব্যাথা। মনে মনে ভাবছিলাম হয়তো আমি করোনায় আক্রান্ত হয়েছি।

সারারাত ঘুমাতে পারিনি।সকালে উঠেই আমার স্ত্রীকে বললাম,সারারাত জ্বর ও শরীর ব্যাথা ছিল।আমার থাকার রুম আলাদা করে দাও।৪ নভেম্বর বুধবার সকাল ১০টায় হাসপাতাল গিয়ে করোনা টেস্ট দিয়ে এসে আমি সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়।আমার বাথরুম ও থাকার রুম আলাদ করে ফেলি।বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া রুম থেকে বের হয়নি।দিনে তিনবার প্যারাসিটামল ও জিম্যাক্স-৫০০ এন্টিবায়োটিক টেবলেট রাতে একটি করে খেতে থাকি এবং তিন থেকে চারবার গরম পানির ভাব নিই এবং লবণ মিশিয়ে কসুম গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করতে থাকি।গোসল ও নামাজের ওযু করার পরই সরিষার তেল গরম করে হাতে, পায়ে ও বুকে মালিশ করতাম। কখনোই ঠান্ডা পানি স্পর্শ করিনি।এতে জ্বর কিছুটা কমে আসলেও রাতে শরীর ব্যাথার কারণে ঘুমাতে পারতামনা।

আমাদের নালিতাবাড়ীর ডাক্তার জনাব শরীফ হাসান কল্লোল বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মরত আছেন।তিনি অনেক ভালো মানের ডাক্তার।আমাদের উপজেলায় ডাক্তার হিসেবে তার জনপ্রিয়তা অনেক।কল্লোল ভাই প্রতি শুক্রবার আমার বন্ধুর ফার্মেসি 'তিন্নি মেডিসিন কর্ণার'এ বসে রোগী দেখেন। যেহেতু শরীরে হালকা জ্বর ছিল তাই ভাবলাম কল্লোল ভাইকে দেখায়।

৬ নভেম্বর,শুক্রবার,সিরিয়াল দিয়ে বসে আছি ডাক্তারের সাথে দেখা করার জন্য।৫ মিনিট পর ডাক্তারের কাছে যাব এমন সময় অপরিচিত নম্বর থেকে আমার মোবাইলে একটি ফোন আসলো।রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলছেন, " আমি ডা নকিব, হাসপাতাল থেকে বলছি।আপনি কেমন আছেন? আপনার বাসায় কে কে আছেন? খাওয়া দাওয়া করেছেন কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।" তিনি আমার সাথে অনেক ভালো ব্যবহার করছিলেন। তখনই আমার অনুমান হয়েছিল আমি হয়তো করোনা পজিটিভ!  আমি ডা. নকিব ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, " ভাই,আমি কী করোনা পজিটিভ? " তিনি চমৎকার ভাবে উত্তর দিলেন, "হ্যা আপনি করোনা পজিটিভ। তবে টেনশন করবেনা।করোনা এখন আর ভয়ের কিছু না।আশাকরি দ্রুতই সুস্থ্য হয়ে যাবেন।সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত কারো সংস্পর্শ যাবেন না।যে কোন সময় আমাকে ফোন দিয়ে পরামর্শ নিবেন।" সত্যিই আমি তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। আমি নকিব ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম," ভাই আমি যদি আমার পছন্দের ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিই কোন সমস্যা হবে? তিনি বললেন, কোন সমস্যা নাই।যার কাছে আপনার ভালো লাগে তাঁর কাছেই চিকিৎসা নিতে পারবেন।সুস্থ্য হওয়ায় বড় কথা।"

নকিব ভাইয়ের সাথে ফোন শেষ করে আমার সমিতির অফিসে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম।কি করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম।আমার ঘনিষ্ট  বন্ধু জমির ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাসুদ ভাইকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানালাম।তারা তখন পরামর্শ দিলে ডা. কল্লোলের সাথে যোগাযোগ করতে।

তিন্নি মেডিসিন কর্ণারের মালিক লিটন ও রিপন ভাইকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানালাম।তারা বললেন রাত ১২টার পর রোগীর চাপ কমলে তখন ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করে দিবেন।যাইহউক,রাত ১২টার পর ডা.শরীর হাসান কল্লোল ভাইয়ের সাথে দেখা করে প্রেসক্রিপশন নিলাম।

বাসায় এসে ওষুধগুলো খেয়ে শুয়ে পড়লাম।রাত ৩টার দিকে হঠাৎ আমার শরীর আগুণের মত গরম হয়ে যেতে লাগলো।চামরার নিচে মনে হচ্ছিল কেউ মরিচ বেটে লাগিয়ে দিয়েছে এই পরিমান জ্বলতে লাগলো।শরীর ঘামছিল এবং থর থর করে কাপতে ছিল।শরীরে কোন শক্তি পাচ্ছিলামনা।অক্সিজেন ৯৮ থেকে ৯৪ নেমে গিয়েছিল।অক্সিজেন বাব বার উঠানামা করছিল।বাসার সবাই তখন গভীর ঘুমে। কাউকে ডাক না দিয়ে নিজেই বার বার গরম পানি দিয়ে গামছা ভিজিয়ে শরীর মুছতেছিলাম আর কলেমা পড়তেছিলাম।যখন বেশি বেশি কলেমা পড়ি তখন শরীরের জ্বলা অনেকটাই কমে আবার যখন পড়া বন্ধ করি তখন জ্বলা বেড়ে যায়। এভাবেই একটি আতংকিত রাত কাটালাম।

সকাল ১০টায় ডা. কল্লোল ভাইকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানালাম।তিনি প্রেসক্রিপশনে দেয়া এন্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ রেখে অন্য ওষুধ চালিয়ে যেতে বললেন।এন্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করাতে শরীরের অস্থিরতা কিছুটা কমে আসলো।শনি ও রবিবার এই দুই দিন আমার খাওয়ার কোন রুচি ছিলনা।খেতে গেলেই বমি আসতো।তারপরেও জোর করে খাওয়ার চেষ্টা করতাম।৯ নভেম্বর সোমবার থেকে খাওয়ার রুচি বাড়তে লাগলো এবং শরীরের দুর্বলতা আস্তে কেটে যেতে লাগলো।

একটি রুমের ভিতরে একা একা ১৪ দিন থাকা আর ১৪ বছরের জেল হওয়া আমার কাছে সমান মনে হয়েছে।সব চেয়ে কষ্ট লেগেছে, আমার দুই মেয়ে। বড়টা ফারিহা তাসকিন বয়স ৮ বছর। ছোট মেয়ে সামিকা ফাইরোজ বয়স ৬ বছর।আমি যখন বাসায় থাকি তখন মেয়েরা আমার কাছে সময় কাটাতে পছন্দ করে।একই বাসায় থাকার পরেও মেয়েরা আমার কাছে আসতে পারতোনা।এটা যে কত কষ্টের যারা এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন তারাই হয়তো বুঝতে পারবেন। আমার মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হতো,"আমার মেয়ে দুটিকে আমার কাছে এনে দাও, আমি তাদেরকে আদর করব তাদের সাথে গল্প করবো।" তখন মনকে বুঝাতাম সব সময় সব ইচ্ছা পূরণ হবার নয়।

মোবাইলে যারা আমাকে পাননি তাদের কাছে ক্ষমা প্রাথনা করছি।কারণ তখন ফোনে কথা বলার মত আমার শক্তি ও মানসিকতা ছিলনা তাই বাধ্য হয়েই ফোন বন্ধ রেখেছিলাম। আপনাদের দোয়া এখন আমি করোনামুক্ত।১৬ নভেম্বর সোমবার ১৪ দিন নামক জেলখানা থেকে মুক্ত হয়েছি।

আমার ছোট বোন সালমা জাহান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।তার হাসব্যান্ড রাসেল তালোকদার কলেজের চিচার।রাসেল ডাক্তারী লাইনে অনেক অভিজ্ঞ।তার পরামর্শ করোনা মুক্তিতে যথেস্ট সহায়ক হয়েছে। রাসেলকে মন থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পরিশেষে আমার স্ত্রী সানজিদা বেগম তিনিও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও সেবায় আল্লাহর রহমতে আজ আমি করোনামুক্ত হয়েছি।এই জন্য আমার স্ত্রীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

পরিশেষে বলব করোনা এমন একটি রোগ হয় মরতে হবে, না হয় করোনাকে মারতে হবে।জ্বর অথবা করোনার কোন প্রকার উপসর্গ দেখা দিলে ভয় না পেয়ে সাথে সাথেই নিজেকে আলাদা করে গরম পানির ট্রিটমেন্ট সহ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।বাসার বাইরে গেলেই অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।কোন অবস্থাতেই অবহেলা করা যাবেনা।অবহেলা করলে জীবন দিয়ে খেসারত দিতে হবে।সবাই ভালো থাকেন এই কামনা করছি।(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত) 


লেখক:ফরিদ আহাম্মদ,সহকারী শিক্ষক,গোজাকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,নালিতাবাড়ী,শেরপুর।
Chief Admin,PTG - Primary Teachers Guild. 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পরিসংখ্যান প্রকাশ করল ফেসবুক কর্তৃপক্ষ

বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পরিসংখ্যান প্রকাশ করল ফেসবুক কর্তৃপক্ষ

করোনা পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হওয়ার গল্প

করোনা পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হওয়ার গল্প

বৃহস্পতিবার ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’, এবার যা থাকছে

বৃহস্পতিবার ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’, এবার যা থাকছে