ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট ২০২১

ছোট গল্প: নিশানপুরের নিতু - মনিরা পারভীন

পাঠকের কলাম

২০২১-০৭-০৫ ১৬:৪১:৫৭ /

প্রতীকী ছবি


নিশানপুর গ্রামে নিতু নামের এক মেয়ে ছিল। তার স্বাস্থ্য ভালো। ফর্সা গায়ের রঙ। কাঁধের নিচ পর্যন্ত  চুল। নিতু নিশানপুর প্রাইমারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তার কোনো ভাই-বোন নেই। বাবা বেসরকারি জব করেন। মা গৃহিণী। একদিন নিতু স্কুল ড্রেস ছাড়া ক্লাসে আসে। ক্লাস টিচার তাকে ডেকে নেন। কারণ জানতে চাইলে নিতু বলে,মা জানেন। টিচার বলেন, আর এসব গেঞ্জি কাপড়ের শর্ট জামা পড়ে আসবে না,কেমন? নিতু মাথা নিচু করে বলে,জি আপা। কিন্তু পরের সপ্তাহে নিতু একই কাজ করে। তখন টিচার তাকে বলেন, তোমার মাকে একটু স্কুলে আসতে বলবে। নিতু সেদিনও মাথা নিচু করে বলে,জি আপা। পরেরদিন নিতুর মা স্কুলে আসেন। ক্লাস টিচার দিশা ম্যাডাম বলেন, স্কুলে সেদিন নিতুকে যে পোশাকে পাঠিয়েছেন তা খুবই দৃষ্টি কটু ছিল। আর স্কুলে কখনো ইউনিফর্ম ছাড়া পাঠাবেন না। আর একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না। সে বড় হচ্ছে। একটু বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। পরিবেশ বুঝতে হবে। তা  না হলে বিপদ হতে পারে। নিতু দেখতেও সুন্দর। বয়স কম হলেও গ্রোথ ভালো।  নিতুর মা সব শুনে বলেন, আচ্ছা আপা। আপনারা তো ওর খারাপ চাইবেন না। বাবা-মায়ের পর শিক্ষকের স্থান। দিশা ম্যাডাম ধন্যবাদ দিয়ে বলেন,আমি বিষয়টি লক্ষ্য রাখব। আপনিও সহযোগিতা করবেন। 


শিক্ষার্থীদের খুব প্রিয় আমাদের এই দিশা ম্যাডাম। তিনিও সহজেই ওদের কাছে টেনে নেন। ওদের মতো করে মিশে যান। কয়েকদিন গত না হতেই দিশা ম্যাডাম দেখেন, নিতুর ব্যাগ ক্লাসে। নিতু নেই। দিশা ম্যাডাম অবশ্য অন্য শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে আজ ক্লাসে আসেন। টিফিনের পরের ক্লাস ছিল। অন্যদের কাছে জানতে চাইলে বলে,মাঝে মাঝে নিতু ক্লাস ফাঁকি দেয়। স্কুলের কথা বলে স্কুলে আসে না। বিষয়টি দিশা ম্যাডামের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। তিনি ক্লাস নেয়া শেষ করেন। রহস্য উন্মোচন করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা করেন। নিতুর সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, নিতু,টিফিনের সময় ব্যাগ রেখে কোথায় গিয়েছ সোনা? ম্যাডামের কথায় তার ভয় কিছুটা কমে আসে। বলে, নার্সারিতে। তিনি অবাক হয়ে বলেন, ওখানে কেন? নিতু এদিক সেদিক দেখে বলে,ফুল নিতে। ম্যাডাম ওর মাথায় হাত রেখে বলেন,আচ্ছা। তবে তুমি ভালো করেই জান যে, স্কুলে এসে আর কোথাও যাওয়া যাবে না। ছুটি হলে একেবারে বাড়ি যাবে। তুমি টিফিন নিয়েই আসবে। না হয় অভিভাবক খাবার ব্যবস্থা করবেন। নিতু মাথা নিচু করে আগের মতোই বলে,জি আপা।

দিশা ম্যাডাম বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখেন। তিনি  সুযোগ বুঝে ওদের ক্লাসের কিছু স্টুডেন্টদের সাথে কথা বলেন। প্রথমে রিতার কাছে জানতে চাইলেন। রিতা একটু লাজুক স্বরে কাচুমাচু করে বলে, আপা নিতু চাতালের পাশে ওই মিল ঘরে যায়। ওখানে বুড়ো করে একজন লোক থাকে। মুখে পাকা দাঁড়ি। খারাপ মানুষ। দিশা ম্যাডাম বলেন, তাই বুঝি? তো নিতু যায় কেন? ওর কেউ হয়? রিতা আরও লজ্জা পায়। সে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু। কথায়  জড়তা আছে। মুচকি হেসে বলে, জানি না আপা।
রিতার সাথে আরও কয়েকজন ছাত্রী ছিল। হেমা বলল,আপা ও নার্সারিতেও যায়। প্রাইভেটের কথা বলে বের হয়। প্রাইভেট না গিয়ে নার্সারি যায়। ম্যাডাম জানতে চাইলেন, কেন যায় জান কিছু? সবাই বলে,জানি না। ওরা একে অপরের দিকে তাকায়,মুচকি হাসে,ঠেলাঠেলি করে। ম্যাডাম বিষয়টি বুঝেও না বোঝার অভিনয় করেন। ক্লাস শুরুর ঘন্টা পড়ে যায়। তিনি রিতার মাথায় হাত রেখে বলেন,পরে আবার গল্প করব। সবাই এখন ক্লাসে যাও।


স্কুলের সামনে বিশাল  মাঠ। অবশ্য  বাউন্ডারি দেয়া আছে। চারপাশে কিছু ফল আর কাঠের গাছ আছে। স্কুলের সামনে বড় রাস্তা। তার একপাশে ছোট একটা দোকান। সেখানে শিশুদের জন্য মুখরোচক খাবার আছে। যদিও স্বাস্থ্য সম্মত নয়, দুই-একটি ব্যতীত।

ম্যাডাম আজ শাড়ি পড়ে এসেছেন। শিশুরা খুব খুশি। কেউ চকলেট,কেউ ফুল,কেউ কাগজের তৈরি উপহার দিচ্ছে। প্রতি ক্লাসে শুনতে হচ্ছে, আপা আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে। আপনি রোজ শাড়ি পড়বেন। কেউ কেউ গা ঘেষে একটু থাকার চেষ্টা করছে। তার ভালো লাগে যখন শিশুরা এমন আনন্দিত হয়। শিক্ষকের স্পর্শ পাওয়ার জন্য কোমলমতি শিশুরা ব্যাকুল থাকে। তিনি অবশ্য শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। কাছে টেনে নেন। ক্লাসের বিভিন্ন কাজের মাঝে শিক্ষার্থীদের স্নেহের পরশ দিয়ে থাকেন। আজ টিফিনের ফাঁকে দিশা ম্যাডাম আবার গল্প জুড়ে দেন। কেউ আচার খাচ্ছে,কেউ চানাচুর, চকলেট,বাদাম। তারা ম্যাডামকে অফার করে খাওয়ার জন্য। তিনি খুশি হন। আর মৃদু হেসে বলেন, তোমরা খাও সোনারা। মিমি এসে বলে, আপা ওই দোকানদার নানাও ভালো না।
তাই নাকি? ভ্রু কুচকে মিস বলেন,কেন খারাপ বলতো?

রিতা ভ্যালভ্যাল করে হাসে। মুখে হাত দিয়ে বলে, আপা যখন দোকানে কেউ থাকে না তখন যেতে বলে। আর কাছে নিয়ে রাখে। পরে চকলেট, আচার খেতে দেয়। তিনি বিষয়টি অনুধাবন করেন। খুব নরম স্বরে বলেন, সবাইকে কিছু কথা বলি। একটু মন দিয়ে শুনবে, আচ্ছা? কেউ একটু ভয় ভয় করছে,কেউ লজ্জা পাচ্ছে,কেউ চিন্তিত বোধ করছে। তিনি বলেন, তোমরা একা কখনো কোথাও যাবে না। এটা স্কুল বা বাসার বাইরে যে কোনো জায়গায় হোক। বাবা-মাকে না বলে কোথাও যাবে না। টিফিনে দোকানে গেলেও কয়েকজন মিলে যাবে। স্কুল ছুটির পর কয়েকজন মিলে বাড়ি যাবে। কোনো পুরুষ মানুষের কাছে একা যাবে না। কেউ মন্দ কথা বললে বা ইশারা করলে মাকে জানাবে। স্কুলে শিক্ষকদেরও জানাতে পার। আমরা তোমাদের বন্ধুর মতো। কোনো দ্বিধা, ভয় রাখবে না, কেমন? সবাই বলে,জি আপা। 

পরের দিন আবার নিতুর মাকে স্কুলে আসতে বলেন দিশা ম্যাডাম। তিনি জানান,নিতুর বিষয়গুলো। নিতুকে টিফিন সাথে দিতে বলেন। স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় সাথে যেন কেউ থাকে। প্রাইভেট পড়তে গেলেও। আরও বলেন,নিতু ছোট। ও অনেক কিছুই না বুঝে করতে পারে। ভালো-মন্দ আমদের বোঝাতে হবে। আমি ওর সাথে কথা বলব। আপনি একটু খেয়াল রাখবেন। নিতুর মা আজ কিছুটা অনুতপ্ত হন। নিজের অসেচতনতা অনুভব করেন। 

দিশা ম্যাডাম পরে নিতুকে ডেকে আনেন। কাছে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, তুমি কি একা বাগানে যাও? নিতু ভয়ে ভয়ে বলে,রোজ যাই না। তুমি ফুল নিতে যাও? নিতু বলে,জি আপা। তারা তোমাকে কিছু বলে না? নিতু মাথা নিচু করে বলে,এক আংকেল ফুল দেয়। বলে,রোজ এলে তোমাকে অনেক ফুল দিব। তিনি জানতে চান আর কি বলে ? নিতু কাঁদ কাঁদ হয়ে বলে, আমার গাল ধরে। হাত ধরে, পা ধরে, গায়ে স্পর্শ করে। আর বলে, আমি খুব মোটা। আংকেলের তাই ভালো লাগে। তিনি নিতুকে কাছে ধরে বলেন, ওসব ভালো নয়। তুমি আর কখনো একা যাবে না। নিতু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

দিশা ম্যাডামের পরামর্শে শিক্ষার্থীরা অনেক সচেতন হয়ে ওঠে। সেই সাথে মা সমাবেশে তিনি অনান্য বিষয়ের পাশাপাশি এসব বিষয়ে আলোচনা করেন। এতে অভিভাবকেরাও সচেতন হন। এভাবে ধীরে ধীরে সকলের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

২০১৯ এর নিয়োগ বিধি দিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়

২০১৯ এর নিয়োগ বিধি দিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়

অদৃশ্য শিকারী

অদৃশ্য শিকারী

করোনা কালীন পাঠশালা: মোঃ আবুল কাশেম মিয়া

করোনা কালীন পাঠশালা: মোঃ আবুল কাশেম মিয়া