ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট ২০২১

সমন্বিত নিয়োগবিধি ও শিক্ষকদের প্রত্যাশা: রাজেশ মজুমদার

মতামত

২০২১-০৭-১৫ ১৮:০৭:০০ /

রাজেশ মজুমদার


জনবল বিবেচনায় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ মন্ত্রণালয় হলো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। আবার এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জনবলই সবচেয়ে বেশী। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জন্য সমন্বিত নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন দাবী দীর্ঘদিন ধরেই। উল্লেখ্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মোট জনবলের প্রায় ৯৫ ভাগই হল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক। সম্প্রতি “প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেটেড অফিসার ও নন গেজেটেড  কর্মচারীদের সমন্বিত নিয়োগ বিধিমালা- ২০২১” সচিব কমিটিতে পাস হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রস্তাবিত এই নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ণের পূর্বে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন শিক্ষক বা শিক্ষক সংগঠনের সাথে আলোচনার হয়নি বা প্রস্তাবও আহ্বান করা হয়নি। নিয়োগ বিধিমালা- ২০২১ সচিব কমিটিতে পাসের পর শিক্ষকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিক্ষকদের ক্ষুদ্র একটি অংশ বিষয়টি নিয়ে খুশি হলেও বৃহৎ অংশ প্রস্তাবিত এই নিয়োগ বিধিমালার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হতাশ ও ব্যাথিত। প্রস্তাবিত এই নিয়োগ বিধিমালাটি পুর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত না হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  প্রস্তাবিত এই নিয়োগ বিধিমালার একটি পৃষ্ঠা ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হওয়া সেই পৃষ্ঠায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও  সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার এই দুইটি পদের নিয়োগ যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে উল্লেখ আছে ।

এই নিয়োগ বিধিমালার ৩৬ নং ক্রমিকে সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার এর ২০৬১ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে শতকরা ২০ ভাগ পথ উন্মুক্ত প্রার্থীদের মধ্য থেকে এবং ৮০ ভাগ পদ বিভাগীয় প্রার্থীদের মধ্য থেকে পূরণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নিয়োগ বিধিমালায় বিভাগীয় প্রার্থী হিসাবে শুধুমাত্র তিন বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অনূর্ধ্ব ৪৫ বছর বয়সী প্রধান শিক্ষকদের বুঝানো হবে বলে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার কলামে দ্বিতীয় শ্রেণী/সমমানের সিজিপিএ সহ স্নাতকোত্তর অথবা দ্বিতীয় /সমমানের সিজিপিএ সহ চার বছর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান) ধারীই বিবেচিত হবে মর্মে উল্লেখ আছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এর অর্গানোগ্রাম অনুসারে  সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার পদটি প্রধান শিক্ষক পদের ঊর্ধ্বতন পদ। একসময় প্রধান শিক্ষকদের এই পদে পদোন্নতিও দেয়া হতো। প্রধান শিক্ষক পদ থেকে সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতি বন্ধ হওয়ার পর প্রধান শিক্ষক পদটি মূলত একটি ব্লকপোস্ট ফলে প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরতদের পদোন্নতির সুযোগ নেই। পদোন্নতির অভাবে প্রধান শিক্ষকরা যেহেতু একই পদে কর্মরত থাকেন সেহেতু প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের স্বল্পতার কারণে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি ও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। তাই, শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত সকল শিক্ষকদেরই প্রাণের দাবি।

সচিব কমিটিতে অনুমোদিত নিয়োগবিধিটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার পদে নিয়োগের জন্য বিভাগীয় প্রার্থী ও উন্মুক্ত প্রার্থী উভয়ের ক্ষেত্রেই একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভাগীয় প্রার্থী হিসাবে বিবেচনার জন্য শুধু প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি করলে হবেনা এই পদেই তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হতে হবে মর্মে বাধ্যবাধকতা দেওয়া আছে। অথচ, একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েই উন্মুক্ত প্রার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না নিয়েই সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলে ধরে নেয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে ১৯৮৩ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক ও পদোন্নতি পায়নি তাই এই বিষয়টি নিশ্চিত ঢাকা মহানগরের কোন সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়ে  তিন বছর পরে সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার আবেদন করবেন এই স্বপ্ন দেখা অলীক কল্পনা। বিষয়টি দেশের প্রতিটি মহানগর ও জেলা শহরে কর্মরত প্রায় প্রতিটি সহকারী শিক্ষকদের বেলায় প্রযোজ্য। 

প্রস্তাবিত নিয়োগবিধির ক্রমিকে ৩৬ নম্বর পদ উপজেলা/থানা সরকারী শিক্ষা অফিসার পদে বিভাগীয় প্রার্থীদের বয়স সীমা ৪৫ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে অথচ একই নিয়োগবিধির ৩৫ নম্বর ক্রমিকে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদের ক্ষেত্রে সরাসরি পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং  বয়সের কোন বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়নি। দশম গ্রেড মর্যাদার উপজেলা থানা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা দ্বিতীয় শ্রেণী অথবা সমমানের সিজিপিএ সহ চার বছরের স্নাতক (সম্মান) নির্ধারণ করা হলেও নবম গ্রেডের পদ হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা কিন্তু স্নাতক নির্ধারণ করা হয়েছে।

উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদে প্রায় আট বছর আগে ২০১৩ সালে সর্বশেষ নিয়োগ হয়েছিল। সেই সময় সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ থাকায় অনেকেই প্রায় ৩৫/৩৬ বছর বয়সে চাকরিতে যোগদান করেছেন। সেই হিসাবে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তিতে সর্বশেষ নিয়োগের  নিয়োগ প্রাপ্ত অনেকের বয়স ৪৫ ছুঁই ছুঁই এবং তার পূর্বের নিয়োগ ২০১০ সালে যারা নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছেন তাদের বয়স ইতিমধ্যে ৪৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার কথা। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষক পদে সর্বশেষ পদোন্নতি হয়েছিল ২০০৯ সালে। পদোন্নতি প্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রায় সকলের বয়স ৪৫ ঊর্ধ্ব। তাই বয়সের বাধ্যবাধকতার কারণে পিএসসি প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের সুপারিশ প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছাড়া উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত/পদোন্নতি প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বেশিরভাগ সহকারী উপজেলা/থানা  শিক্ষা অফিসার পদে আবেদন করারই সুযোগ পাবেন না। 

বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে। ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষের পূর্বে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিন বছর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান)  চালু ছিল। অথচ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদে শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে চার বছর মেয়াদি অনার্স নির্ধারণ করা হয়েছে। চার বছর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান) যোগ্যতা নির্ধারণ করার কারণে অনেক প্রধান শিক্ষকের আবেদনের বয়স থাকার পরেও আবেদন করতে পারবেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই মুহূর্তে সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে একটি উপজেলার সর্বমোট ১০২ টি বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে বয়সের কারণে মাত্র চারজন আবেদন করার যোগ্যতা রাখেন। যে সংখ্যাটি সেই উপজেলার মোট প্রধান শিক্ষক পদের শতকরা চার ভাগেরও কম ।

উপরের বিষয়গুলো বিবেচনায় করে ধরে নেওয়া যায় মূলত পিএসসি থেকে প্রধান শিক্ষক পদে সুপারিশকৃত হয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছাড়া তেমন কেউ বিভাগীয় প্রার্থীতার সুযোগ পাবেন না। নিয়োগ বিধিমালাটি গেজেট আকারে প্রকাশের পরেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। ফলে ততদিনে বিভাগীয় প্রার্থীর সংখ্যা বর্তমান থেকে আরও কমে যাবে। এখানে উল্লেখ্য, সহকারী উপজেলা থানা শিক্ষা অফিসার পদে নিয়োগের শর্তের মধ্যে স্পষ্টতা উল্লেখ করা হয়েছে উপযুক্ত প্রার্থী না পেলে উন্মুক্ত নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। ফলে নিয়োগের শর্ত মোতাবেক বিভাগীয় প্রার্থীর অভাবে বেশিরভাগ পদই উন্মুক্ত প্রার্থীদের পূরণ হবে। 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত অধিকাংশ সহকারী শিক্ষক ৪৫ বছর বয়সের পূর্বে পদোন্নতি পায়না। অন্যদিকে ডিপার্টমেন্টের অন্য কোন পদে বিভাগীয় প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না থাকায় এই শিক্ষকদের পদ পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।যেহেতু প্রধান শিক্ষক পদটি একটি ব্লকপোস্ট এবং প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ না থাকলে সহকারি শিক্ষক পদ থেকে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব নয় তাই সকল প্রধান শিক্ষকের মত অধিকাংশ সহকারী শিক্ষককেই অবসর পর্যন্ত একই পদে কর্মরত থাকতে হবে। বিষয়টি সকল শিক্ষকের জন্য হতাশার এবং কষ্টের। তাই নিয়োগবিধি পুনরায় পর্যালোচনা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত সকল শিক্ষকদের বিভাগীয় প্রার্থী ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করা সকল শিক্ষকের অন্যতম দাবি।

লেখক: রাজেশ মজুমদার
সিনিয়র সহ সভাপতি
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি,কেন্দ্রীয় কমিটি।

বাংলাদেশ শিক্ষা/এফএ

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

২০১৯ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিতে শিক্ষাগত যোগ‍্যতায় সংস্কার জরুরি

২০১৯ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিতে শিক্ষাগত যোগ‍্যতায় সংস্কার জরুরি

শিক্ষকের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় সমন্বিত নিয়োগবিধি সংশোধন চায় ঐক্য পরিষদ

শিক্ষকের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় সমন্বিত নিয়োগবিধি সংশোধন চায় ঐক্য পরিষদ

প্রসঙ্গ: সমন্বিত নিয়োগবিধি-২০২১

প্রসঙ্গ: সমন্বিত নিয়োগবিধি-২০২১