ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

নালিতাবাড়ীর আদিবাসী-সম্প্রদায় গোস্টির কেমন চলছে দিন-কাল

জাফর আহম্মেদ

২০২১-০৮-৩১ ১৯:০৭:৪৫ /

ফাইল ছবি

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকাজুড়ে কোচ, গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের আদিবাসীরা সুদীর্ঘকাল থেকে বসবাস করে আসছে । এই এলাকাটি আবার গারোপাহাড় হিসেবেও খ্যাত। একসময় এই এলাকার আদিবাসীদের গোলাভরা ধান আর পুকুরভরা মাছ ছিল। তারা বছরজুড়ে সাংস্কৃতিক ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। এখন কালের বিবর্তনে আদিবাসীদের নানা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-ইতিহাস বিলুাপ্তর পথে।

 নালিতাবাড়ী উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে  সহস্রাধিক পরিবারে প্রায় ৫০ হাজার আদিবাসী লোকজন নানা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে বাপ-দাদার বসতভিটায় বসবাস করে আসছেন। এসব সম্প্রদায়ের রয়েছে আলাদা কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও আলাদা সমাজব্যবস্থা। গারোরা খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী আর কোচ ও হাজং সম্প্রদায়ের লোকজন সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

গারো আদিবাসীরা মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত পরিবার। গারোদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো বড়দিন। এছাড়াও প্রতিবছর স্টার সানডে, তীর্থ উৎসব, ইংরেজি নববর্ষ পালন ও নতুন ফসল গোলায় তোলার আগে ওয়ানগালা উৎসব পালন করে থাকে। কোচদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপূজা ও কালীপূজা উৎসব। এসব ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও আদিবাসীরা অলাদা আলাদা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। কালের বিবর্তনে বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসব গারো, হাজং ও কোচ আদিবাসীদের হাজার বছরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই তাদের ঐতিহ্য সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারি-বেসরকারিভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে কোচ আদিবাসী নেতা বনকুড়া এলাকার সুমন্ত বর্মন বলেন (৫০) জানান।

নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পানিহাটা, তাড়ানি, পেকামাড়ি, মায়াঘাসি, নাকুগাঁও, দাওধারা, আন্ধারুপাড়া, খলচান্দা, বুরুঙ্গা, বাতকুচি, সমেশ্চুড়া, খলিসাকুড়ি, গাছগড়া, নয়াবিল এলাকায় কোচ ও গারো আদিবাসীদের বসবাস। অনাদিকাল থেকেই এসব এলাকায় বাপ-দাদার বসতভিটায় আদিবাসীরা বসবাস করে আসছে। চলমান পৃথিবীতে বিশ্বের সব মানুষের জীবনমান বাড়লেও আবিাসীদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি বরং তাদের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।

আদিবাসী নেতা মি. নবেশ খিশ্সি বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে আদিবাসীদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে আছে (আদিবাসীদের ভাষায়) মান্দিদামা, ক্রাম, খোল, নাগ্রা, জিপসি, খক, মিল্লাম, স্ফি, রাং, বাঁশের বাশি, আদুরী নামের বাদ্যযন্ত্র ও পোশাক দকবান্দা, দকশাড়ি, খকাশিল, দমী, রিক মাচুল আর কোচ আদিবাসীদের রাংঙ্গা লেফেন ও আছাম হারিয়ে যেতে বসেছে। আর খাদ্যের তালিকায় রয়েছে বাঁশের কড়ুল আর চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি খাবার উপকরণ ‘মিয়া, কলাপাতায় করে ছোট মাছ আগুনে পোড়া দিয়ে খাওয়া, যার নাম ‘ইথিবা’ মুরগির বাচ্চা পোড়া দিয়ে বাঁশের চোঙ্গায় ভরে পিয়াজ ও কাঁচামরিচ দিয়ে ভর্তা করে খাওয়া, যার নাম ব্রেংআ, মিমিল, কাঁকড়া, শামুক ও শূকরের গোস্ত, চালের তৈরি মদ, যার নাম চু আর কোচ আদিবাসীদের কাঠমুড়ি ইত্যাদি খাবার উপকরণ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে।

সীমান্তঘেঁষা খলচান্দা গ্রামের কোচ আদিবাসী দষিন্দ্র কোচ (৪০) বলেন, এখানে কোচ সম্প্রদায়ের এক সময় ৫০টি পরিবারের বেশি বসবাস করত। বর্তমানে ২০/২৫টি পরিবার বসবাস করে। এ গ্রামের নারী ও পুরুষেরা কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ ও বাঁশ দিয়ে ঢোল তৈরি করে তারা সংসার চালান। অধিকাংশ বাড়িতে কাঁচা পায়খানা। এ গ্রামে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পরিচালিত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত একটি বিদ্যালয় ছাড়া নেই কোনো সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এ পাড়ার শিশুরা সাধারণত পড়ালেখা করে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড়দের সঙ্গে চাষাবাদের কাজে জড়িয়ে পড়ে। সারা গ্রামে কয়েকটি নলকূপ থাকলেও বছরের বেশির ভাগ সময় নষ্ট থাকে। তাই মাটির কূপ ও নদীর পানিই তাদের ভরসা। কোনো রোগ হলে তাদের ছুটে যেতে হয় সাড়ে তিন কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে মিশনারি হাসপাতালে। সেখানে না যেতে পারলে ২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যেতে হয় উপজেলা সদরে। গ্রামটিতে কোনো পাকা সড়ক নেই। শুষ্ক মৌসুমে কাঁচা সড়কে চলাফেরা করতে পারলেও বর্ষায় চলাচলে সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

পোড়াঁগাও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বন্ধনা চাম্বুগং বলেন, আমরা বন-পাহাড়ে যুদ্ধ করে অসহায় জীবন যাপন করে আসছি। তাই পেটের তাগিদে ইতিহাস, ঐতিহ্য বুঝি না, শুধু এটাই বুঝি বেঁচে থাকতে হবে। নিজস্ব ভাষায় কথা বলার জন্য কোচদের আছে কোচ ভাষা আর গারোদের আছে আচিক ভাষা। বর্তমানে এই দুই ভাষাতেও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণ হয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাদের নিজস্ব ভাষার ফাঁকে ফাঁকে বাংলা জুড়ে দিয়ে কথা বলেন।

নিজস্ব ভাষা সংরক্ষণের তথা মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য কোচ আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় স্কুল প্রতিষ্ঠার দাবিও জানান খলচান্দা গ্রামের শিক্ষক শ্রী পরিমল কোচ (৩৬)। ওই গ্রামের মন্ডল (মাতব্বর) শ্রী শবরন্ত কোচ (৭৫) বলেন, যুগের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনেকটাই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।

আদিবাসী সংগঠন ট্রাইভাল ওয়েল ফেয়ার এসোসিয়েশনের (টিডাব্লিউএ) সাবেক চেয়ারম্যান মি. লুইস নেংমিনজা জানান, আদিবাসীদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংরক্ষণে নালিতাবাড়ীতে আমরা কালচারাল একাডেমি স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। যা আদিবাসীদের বিলুপ্ত হতে চলা বিভিন্ন উপকরণ স্মৃতি স্বরূপ যুগ যুগ ধরে সংরক্ষিত থাকবে।

উল্লেখ্য, ৩শ ২৭ দশমিক ৬১ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় ১টি পৌরসভা, ১২টি ইউনিয়ন, ৩টি খ্রিষ্টান মিশন, ২টি আদিবাসী কমিউনিটি সেন্টার ও ১শ ৯৯টি গ্রামে ২ লাখ ৫১ হাজার ৮শ ২০ জন লোকের বসবাস। আদিবাসী গারোসম্প্রদায় বেশি বসবাস করে,পোড়াগাও ইউনিয়ন,রামচনদ্রকুড়া ইউনিয়ন,নয়াবিল ইউনিযন,কাকরকান্দি ইউনিয়ন,নন্নি ইউনিয়ন,ও রুপনারায়নকুড়া ইউনিয়নে,তবে  ওয়াল্ড ভিশন যখন ছিলো তখন গারোসম্প্রদায়ের লোকজনের জীবন-মানউন্নয়নে অনেক ভালো ছিলো, ওয়াল্ড ভিশন চলে যাওয়ার পর থেকে কেউ জবিীকার তাগিদে ঢাকা চলে গেছেন স্বপরিবারে, আবার কেউ কৃষি কাজ করে কোন ভাবে জীবন দারণ করছেন ।

বাংলাদেশ শিক্ষা/জাআ

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

পিইসি পরীক্ষা ও শিক্ষক বদলী বিষয়ে যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী

পিইসি পরীক্ষা ও শিক্ষক বদলী বিষয়ে যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী

নিজ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে মিলল প্রধান শিক্ষকের ঝুলন্ত মরদেহ

নিজ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে মিলল প্রধান শিক্ষকের ঝুলন্ত মরদেহ

নালিতাবাড়ীতে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই  শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

নালিতাবাড়ীতে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু