ঢাকা, রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২

লিভার সিরোসিস কতটা মারাত্মক

ডা. ফারুক আহমেদ

২০২১-১২-০৪ ১২:১১:০৫ /


খাদ্য গ্রহণের পর তা হজম প্রক্রিয়ার জন্য লিভার পিত্তরস এনজাইম বা পাচকরস প্রস্তুত করে। এর মাধ্যমে হজম প্রক্রিয়া শেষে খাদ্যনালি থেকে শোষিত পুষ্টি পোর্টাল সার্কুলেশনে রক্তের মাধ্যমে লিভারে পুনঃপ্রক্রিয়া শেষে শরীরের বিভিন্ন অংশে সরবরাহ করে। এছাড়া দেহের জন্য আবশ্যিক আমিষ ও চর্বি তৈরি করা, গ্লুকোজ, ভিটামিন ‘এ’-সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো জমা করা ও ঘাটতির সময় তা রক্তে নিঃসরণও লিভার করে থাকে। মুখে সেবনকৃত বা শিরাপথে প্রয়োগকৃত ওষুধ প্রয়োজনীয় অংশটুকু রেখে বাকিটা নিষ্ক্রিয় করে শরীরের বিপাকক্রিয়ার পর বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন করাও লিভারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ উপকারী অঙ্গটি স্বল্পমেয়াদি প্রদাহ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ-এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হেপাটাইটিস এ, বি, ই বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে লিভারে সাধারণত একিউট হেপাটাইটিস হতে পারে। এ থেকে রোগী দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যেই আরোগ্য লাভ করে। হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি লিভারের চর্বিজনিত রোগ। অ্যালকোহল ও কিছু জন্মগত রোগের কারণে ক্রনিক হেপাটাইটিস হতে পারে যা থেকে পরবর্তীতে লিভার সিরোসিস রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার রোগী লিভার সিরোসিস ও নানা জটিলতায় মৃত্যুবরণ করে। ক্রনিক হেপাটাইটিস বা দীর্ঘমেয়াদি লিভার প্রদাহের ফলে লিভারের মধ্যে ফাইব্রাস টিস্যু (আঁশজাতীয় পদার্থ) তৈরি হতে থাকে, যার কারণে লিভার ধীরে ধীরে শক্ত ও সংকুচিত হতে থাকে ও তার কর্মক্ষমতাও হ্রাস পেতে থাকে। এ প্রক্রিয়ার একটি পর্যায়ে পুরো লিভারজুড়েই অজস্র দানার মতো গুটি তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের কারণে ফাইব্রোসিস বা আঁশ তৈরি, গঠনতন্ত্রের তারতম্য, শক্ত ও সংকুচিত লিভারে গুটি তৈরি হওয়ার অবস্থাকে লিভার সিরোসিস বলা হয়।

যদিও লিভার হতে সুই-এর মাধ্যমে বায়োপসি করে সেই টিস্যু মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করে সিরোসিস ডায়াগনোসিস করা উচিত। কিন্তু লিভার প্রদাহের কারণ, রোগীর শারীরিক লক্ষণ, ল্যাবরেটরির রক্ত ও অন্যান্য পরীক্ষা বিশেষ করে আলট্রাসনোগ্রাম, এন্ডোসকপি ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে ‘লিভার বায়োপসি’ ছাড়াই লিভার সিরোসিস ডায়াগনোসিস করা যায়। লিভার সিরোসিসের দুটি স্টেজ আছে। একটি হচ্ছে কমপেনসেটেড বা ক্ষতিপূরণযোগ্য সিরোসিস, যাতে সাধারণত রোগীর তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশিত হয় না। তবে অবসাদগ্রস্ততা, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, ওজন হ্রাস পাওয়া, বুক ও পিঠে মাকড়সার জ্বালের মতো লাল স্পট দেখা দেওয়া ও পুরুষের ক্ষেত্রে অন্ডকোষ ছোট হয়ে যাওয়া, বুকের বাম পাঁজরের নিচে প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া, ইত্যাদি লিক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে।

ডিকমপেনসেটেড বা ক্ষতিপূরণ অযোগ্য সিরোসিসে পেটে পানি আসা, জন্ডিস, মস্তিষ্কের এনকেফালোপ্যাথি বা রক্তবমি ইত্যাদি জটিলতা দেখা দেয়। যে কারণেই লিভারের দীর্ঘমেয়াদি (৬ মাসের অধিক সময়ব্যাপী) প্রদাহ হোক না কেন, এ সংকুচিত, শক্ত, গঠনতন্ত্রের তারতম্য হওয়া ও কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া লিভারের কারণে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব জটিলতা ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে বাড়তে পারে যা রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

খাদ্যনালির রক্তক্ষরণ লিভার সিরোসিসের অন্যতম জটিলতা। বারংবার প্রদাহজনিত কারণে লিভারের মধ্যে ফাইব্রোসিস (আঁশজনিত) এর ফলে সৃষ্টি গঠনগত পরিবর্তন এর জন্য ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদান্ত ও সংশ্লিষ্ট অর্গানগুলো থেকে লিভারের মধ্যে রক্তপ্রবাহের শিরার (পোর্টাল ভেইন) শাখা প্রশাখাগুলোতে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। যার ফলে খাদ্যনালিসহ যেসব অর্গান থেকে পোর্টাল ভেইনে রক্ত প্রবাহিত হয়, সেগুলোতে ব্যাক প্রেসারের কারণে শিরাগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় ও পরবর্তীতে শিরা ফেটে রক্তক্ষরণ হয়ে রক্তবমি ও কালো পায়খানা হতে পারে। ইসোফেজিয়াল ভেরিক্স জিয়েট্রিক ভেরিক্স বা খাদ্যনালির সংগীত শিরা ফেটে গিয়ে সাধারণত রক্তক্ষরণ হয়, তবে অনেক সময় গ্যাস্টিক বা ভিওকেনাল আলসার বা গ্যাস্টোপ্যাথিক থেকেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। এক্ষেত্রে রোগিকে হাসপাতলে ভর্তি করে প্রয়োজনে রক্ত পরিসঞ্চালনসহ অন্যান্য জরুরী চিকিৎসার পর এন্ডোসকপি করে রক্তক্ষরণের কারণ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হয়। ইসোফেজিয়াল ভেরিক্স থেকে রক্তক্ষরণ হলে ওষুধের পাশাপাশি এন্ডোসকপির মাধ্যমে স্ফীত শিরাতে ব্যান্ড পরানো ও রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হয়। পূনরায় রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য ও বারবার পেটে পানি আসার জন্য টিআইপিএসএস নামে আরেকটি চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়। তবে টিআইপিএসএস করার পর দূষিত পোর্টাল ভেইনের রক্ত লিভারকে বাইপাস করে মস্তিষ্কে চলে যায় বলে হেপাটিক এনকেফালোপ্যাথি (যা লিভার সিরোসিসের আরেকটি মারাত্মক জটিলতা) ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এমনকি টিআইপিএসএস করার সময়ও হার্ট ও কিডনি রোগে আক্রান্তদের প্রসিডিউরের কারণে জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বর্তমানে বিশ্বে তাই টিআইপিএসএসের প্রচলন কমে আসছে।

প্রতি বছর লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের শতকরা চার জনের লিভার ক্যান্সার দেখা দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ও সঠিক নিয়মে চিকিৎসা করা হলে লিভার ক্যান্সার থেকে নিরাময় সম্ভব।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, লিভার রোগ বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

 ক্যান্সারের পরীক্ষামূলক ওষুধে শতভাগ সাফল্য পেয়েছে বিজ্ঞানীরা

ক্যান্সারের পরীক্ষামূলক ওষুধে শতভাগ সাফল্য পেয়েছে বিজ্ঞানীরা

 উপবৃত্তির টাকা পেতে যেভাবে প্রোফাইল হালনাগাদ করতে হবে

উপবৃত্তির টাকা পেতে যেভাবে প্রোফাইল হালনাগাদ করতে হবে

পায়ুপথে ক্যান্সার বুঝবেন কীভাবে, কী করবেন?

পায়ুপথে ক্যান্সার বুঝবেন কীভাবে, কী করবেন?