ঢাকা, রবিবার, ৩ জুলাই ২০২২

গল্পটা শেরপুর নালিতাবাড়ীর। গল্পটা লুৎফর আলীর

সুমন নূর

২০২২-০৫-৩১ ১৮:০৫:১১ /

 

গ্রীষ্মের কাঠফাটা রৌদ্রে তড়িঘড়ি করে রিক্সায় উঠলাম। সাথে ফুপু এবং উনার স্কুলপড়ুয়া ছেলে। প্রথমে খেয়াল করিনি। ভেবেছিলাম মোটরচালিত রিক্সা। কিছুদূর আগাতেই শরীর শীতল হতে থাকে। পায়ে চালিত! উনিও মানুষ, আমরাও মানুষ। এরকম একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষের রিক্সায় তিনজন চাপা কী সম্ভব! বিবেক খুব তাড়া করতে থাকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে- আমি নিজেই রিক্সা টানছি, তিনজন প্যাসেঞ্জার! রিক্সাওয়ালার দরদর করে ঝড়া ঘাম যেনো আমার শরীর থেকে ঝড়ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম নেমে পড়ি। আবার ভাবলাম, মাঝপথে উনি যাত্রী পাবেন না। অথবা আমাদের চেয়ে ভারি কোনো প্যাসেঞ্জার! উনাকে তো নিতেই হবে। না করার উপায় নেই। নেমে পড়া বা দুই চার পয়সা ভাড়া বাড়িয়ে দেয়াও সমাধান না। স্থায়ী কোনো বন্দোবস্ত প্রয়োজন!

রিক্সা থেকে নেমে উনার গল্প শুনলাম। লুৎফর আলী, বয়স ৬৪। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার, কলসপাড় ইউনিয়নের বালুঘাটা ঘোনাপাড়া গ্রামে বাড়ি। বলার সাহস পেলাম না, এই বয়সে কেন রিক্সা চালান? উনার নিজস্ব কোনো ফোন নেই, কারও নাম্বারও জানেন না। আপাতত ফুটপাতের দোকান থেকে কাগজ কলম নিয়ে মোবাইল নাম্বার লিখে দিলাম। বললাম- ঠিক রাত ৮ টার পর যেকোনো নাম্বার থেকে ফোন করবেন। কণ্ঠ শুনলেই ফোন ব্যাক করবো। নাম্বারটা খুব যত্ন করে দুইভাজ দিয়ে বুক পকেটে রেখে দিলেন। রাত নয়টার দিকে এক অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন। 'আমি তোমার রিক্সাওয়ালা চাচা'। মনে হলো কতদিনের চেনা, কতটা নির্ভার হয়ে বলছেন, তোমার চাচা বলতেছি! এই যে বিশ্বস্ততা বা আস্থার জায়গা, যেখান থেকে ভাই, চাচা কিংবা বাবা ডাক শুনতে পাই। ভীষণ ভয় লাগে, তারা যতোটুকু আশাকরেন ততোটুকু করতে না পারলে অনুশোচনা তাড়িয়ে বেড়ায়। বললাম, চাচা প্রথমত আপনার জন্য বয়স্কভাতা কার্ডের চেষ্টা করবো। উনি ভীষণ খুশী। 'বাজান ভাতাকার্ড পেলে আমার অনেক উপকার হয়। চেষ্টা করবাইন?' অবশ্যই করবো। কথা দিলাম। 

ফোন রাখার পর মনে হলো, কথা দিয়ে ভুল করলাম না তো? শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ অচেনা এলাকা। আমি কেন, আমার তিন পুরুষের কেউ সেখানে গিয়েছে বলে মনে হয় না। তবে বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতজনের মাধ্যমে প্রায় সকল উপজেলাতেই চেনাজানা লোক আছে। নালিতাবাড়িতে কে আছে? খুঁজতে থাকলাম। যাকে তাকে দিয়েও তো কাজ হবে না। এমন একজনকে প্রয়োজন যিনি ভাতাকার্ডের রিকুয়েষ্টটা ফেলবেন না, রাখবেন। নালিতাবাড়ী আসনের এমপি মতিয়া চৌধুরী। সাবেক কৃষিমন্ত্রী এবং বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী নেত্রী। উনাকে বলতে পারলে কাজ হবে। কিন্তু উনার এপোইনমেন্ট পাওয়া কঠিন। অন্য কোনো উপায়? ফেসবুকে ইউএনওকে সার্চ করলাম। মনে হলো ইউএনও সোসাল মিডিয়ায় খুব বেশী একটিভ না। তাহলে কী ইউএনওর কাছেও পৌঁছাতে পারবো না? অনেক ঘাটাঘাটির পর ফরিদ আহাম্মদ নামের একজন শিক্ষককে পেলাম। যিনি নালিতাবাড়ী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। প্রোফাইল দেখে মনে হলো ইউএনওর কাছের মানুষ, যিনি ইউএনও পর্যন্ত কথাগুলো পৌঁছে দিতে পারবেন। সবচেয়ে বড়ো কথা ফরিদ আহাম্মদ নিজেও অসম্ভব মানবিক মানুষ। উনাকে টেক্সট করলাম। রিপ্লাই দিলেন। অনুমতি নিয়ে সরাসরি ফোন করলাম। বিস্তারিত জানালাম।  লুৎফর চাচার এনআইডি, নাম, পরিচয়। 

ফরিদ আহাম্মদ বললেন, উনাদের কলসপাড় ইউনিয়ন। সেখানকার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ইয়াং মানুষ এবং খুবই আন্তরিক। লুৎফর চাচা আগেরদিন ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরেছেন। বললাম, ফরিদ আহাম্মদ স্যারকে ফোন করতে। সকালের ঘটনা। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই ফরিদ আহাম্মদ নিজেই ফোন করলেন। খুব ভালো একটা কাজ হয়েছে। বললাম- যেমন? 'আজকে আমাদের মাসিক মিটিং ছিলো, নালিতাবাড়ীর সকল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান উপজেলা মিটিংয়ে উপস্থিত, ঠিক তখনি লুৎফর চাচা হাজির'। ফরিদ আহাম্মদ উপজেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সদস্য হওয়ায়, উপস্থিত সবার সামনে লুৎফর চাচার বিষয়টা তুলে ধরেছিলেন। কলসপাড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও সবকিছু শুনে সবার সামনে কথা দিলেন, উনার বয়স্কভাতার ব্যবস্থা করে দিবেন। উল্লেখ্য, এনআইডি অনুসারে লুৎফর চাচার বয়স আড়াইমাস কম আছে। আড়াইমাস খুব বেশী সময় না। নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত যখন পৌঁছেছে। নালিতাবাড়ীর সকল ইউপি চেয়ারম্যানের সামনে যখন কলসপাড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কথা দিয়েছেন। সেকথার বরখেলাপ হবে না। 

পরিষদ থেকে বেড়িয়ে অচেনা নাম্বার থেকে ফোন। আমি তোমার চাচা! রিক্সাওয়ালা চাচা। ময়মনসিংহ-এর আঞ্চলিক ভাষা হওয়ায় বাক্যগুলো খুব বেশী বুঝতে পারলাম না। শুধু অনুভব করলাম রিক্সাওয়ালা চাচার ভেতরকার আবেগ, অনুভূতি। কৃতজ্ঞতায় জড়িয়ে যাওয়া শব্দগুলো। সামনে থাকলে হয়তো চোখবেয়ে গড়িয়ে পড়া পানির দৃশ্যটা দেখতে পেতাম। মানুষের এই চোখের পানিটা আমার প্রিয়। ভীষণ প্রিয়।

সু ম ন  নূ র
লেখক ও সমাজকর্মী 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

স্বপ্নের পদ্মা সেতু: ফরিদ আহাম্মদ

স্বপ্নের পদ্মা সেতু: ফরিদ আহাম্মদ

বিশেষায়িত প্রাথমিক শিক্ষার জন্যে: ড. মো.আনিসুজ্জামান

বিশেষায়িত প্রাথমিক শিক্ষার জন্যে: ড. মো.আনিসুজ্জামান

 শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি প্রসঙ্গ: ড. মো. আনিসুজ্জামান

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি প্রসঙ্গ: ড. মো. আনিসুজ্জামান