ঢাকা, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

ভর্তি কলেজে, পড়ে কোচিং সেন্টারে: ড. মো. আনিসুজ্জামান

মতামত

২০২২-০৮-১২ ২৩:০২:১৬ /

 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে সম্মান এবং কোনো কলেজে এমএ পর্যন্ত পড়ানো হয়। অনেক কলেজে সম্মান শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়, ভবিষ্যতে এমএ পর্যন্ত পড়ানো হবে। দেশে উচ্চশিক্ষা প্রসারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে নারীশিক্ষা প্রসারে কলেজগুলোর ভূমিকা প্রশংসনীয়। দেশে অনেক মহিলা কলেজ আছে, যেগুলোতে শুধু নারী শিক্ষার্থীরাই বিভিন্ন বিষয়ে সম্মান এবং এমএ শ্রেণিতে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছে। এমএ এবং সম্মান শ্রেণির পাশাপাশি এসব কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ও বিএ, বিএসসি, বিকম পাস কোর্স পড়ানো হয়। কলেজগুলোতে সম্মান ও এমএ শ্রেণি পাঠদানের অনুমতির আগে দফায় দফায় পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শক হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অভিজ্ঞ শিক্ষকরাও থাকেন কখনো কখনো।

কলেজগুলোতে পড়াশোনার মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইন্টারমিডিয়েটের শিক্ষার্থীরা কলেজের চেয়ে হাউস টিউটর ও কোচিংয়ে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কলেজগুলোর মধ্যে রাজশাহী কলেজ সবচেয়ে ভালো এবং পর পর চারবার শ্রেষ্ঠ কলেজ নির্বাচিত হয়েছে। এই কলেজ মাঠে গেলে একটি পবিত্রতার ভাব জন্মে যে এটি সত্যিকারের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজ বিল্ডিংগুলো দৃষ্টিনন্দন এবং পুকুরপার সাজানো-গোছানো। এর পেছনে কলেজ অধ্যক্ষ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবদান কম নয়। এই কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের কোনো শিক্ষার্থী পর পর তিন দিন অনুপস্থিত থাকলে কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীর বাড়িতে খোঁজখবর নেয়। কলেজে ক্লাস করা বাধ্যতামূলক হওয়ায় আমার পরিচিত এক শিক্ষার্থী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়নি। সে কোচিং ও হাউস টিউটর নির্ভরশীল। মফস্বলের কলেজগুলোর চিত্র একেবারে ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি এমন সহকর্মীও পেয়েছি, যিনি কলেজজীবনে একটি-দুটি ক্লাস করেছেন, তবে তাঁরা প্রত্যেকেই পাঁচ-ছয়জন শিক্ষকের কাছে পড়েছেন।
আমার এক বন্ধুর সঙ্গে ছাত্রজীবনের পর ইতিহাস বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলনে দেখা হয়েছিল। তিনি একটি বেসরকারি কলেজে ইতিহাস পড়ান। তিনি জানালেন, কলেজে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে চায় না। বিএ শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিবছর এক শর ওপর ভর্তি হয়। এক দিন-দুই দিন চার-পাঁচজন ক্লাস করে, আর নেই। কেউ এসে বলে, বিয়ে হয়েছে, আবার কেউ বলে গার্মেন্টে চাকরি করে ইত্যাদি। রাজশাহী থেকে সিল্কসিটি ট্রেনে ঢাকায় যাওয়ার সময় এমন একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সে ঈশ্বরদী এসেছিল বিএ পরীক্ষার জন্য। গাজীপুরে সে চাকরি করে। চাকরির পাশাপাশি বিএ পরীক্ষা দিচ্ছে। শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীর মানসিক উদ্যম দেখে ভালো লাগল। শেরপুরে অটোরিকশায় যাওয়ার সময় পাশের সিটে বসা মেয়েটিকে দেখে মনে হলো কোনো কলেজে পড়ে। জিজ্ঞেস করায় সে জানায়, বাংলায় অনার্স পড়ে স্থানীয় কলেজে। কোনো দিন সে কলেজে ক্লাস করেনি। কলেজে বাংলা বিভাগে কতজন শিক্ষক আছেন, তা সে জানে না। তার সঙ্গে কতজন কলেজে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছে, তা-ও সে জানে না। রাজশাহী থেকে ট্রেনযোগে হিলি যাওয়ার সময় স্থানীয় মহসিন কলেজের ম্যানেজমেন্টের শিক্ষার্থী শাম্মীর সঙ্গে পরিচয় হয়। শাম্মী জানায়, সে অনার্স পড়ে। কিন্তু কলেজে যায় না। কোচিং সেন্টার আর প্রাইভেট টিউটর। এমন শত শত উদাহরণ দেওয়া যাবে। ভর্তি কলেজে, পড়ে কোচিং সেন্টারে। কলেজের শিক্ষকরাই ক্লাস নেন কোচিং সেন্টারে। নালিতাবাড়ী উপজেলার নাজমুল স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে এমপিওভুক্ত শিক্ষক দুজন। সম্মান শ্রেণির জন্য আরো পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এসব শিক্ষকের বেতন-ভাতা নেই। তাঁরা কলেজে আসতে আগ্রহী নন। তাঁদের মধ্যে অনেকে অন্য চাকরি জুটিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে খণ্ডকালীন তিনজন শিক্ষক দিয়ে সম্মান, বিএ পাস এবং ইন্ডারমিডিয়েটের ক্লাস চলছে। বেশির ভাগ কলেজের শিক্ষকসংখ্যা এমনই। বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো কলেজ রাজশাহী কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এমএ শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৬০। ৫৬০ জন শিক্ষার্থীকে কোথায় কিভাবে ক্লাস নেওয়া সম্ভব। সম্মান শ্রেণি রয়েছে। প্রাইভেট পরীক্ষার্থী রয়েছে আরো হাজারের ওপর। শিক্ষক মাত্র ১২ জন। ১২ জন শিক্ষক দিয়ে কিভাবে সব কাজ সম্ভব! অসম্ভবকে সম্ভব করাই কি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নয়? অসম্ভবকে সম্ভব করতে গিয়ে আমরা কি জাতীয় সমস্যা সৃষ্টি করছি কি না, তা-ও দেখা দরকার। এমএ ও সম্মান শ্রেণিতে পড়ানোর জন্য শিক্ষকের সামান্য হলেও পড়তে হয়। এত কাজের পর শিক্ষকদের পড়ার আর কি কোনো সক্ষমতা থাকে? রাজশাহী কলেজ বিভাগীয় পর্যায়ের কলেজ বলে এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ১২ জন শিক্ষক রয়েছেন। মফস্বলের কোনো কোনো সরকারি কলেজে তিন-চারজন শিক্ষক দিয়েও পাঠদান চলে।

সরকারি কলেজ শিক্ষকদের সম্মান ও এমএ শ্রেণিতে পাঠদানের জন্য উচ্চতর গবেষণার মূল্যায়ন হয় না বলে শুনেছি। শিক্ষকদের উঁচু মানের প্রকাশনার কোনো আলাদা মূল্যায়ন কাজ করে না প্রমোশনের ক্ষেত্রে। ফলে শখের বসে অনেকে এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মজীবনে এসব ডিগ্রির কোনো মূল্যায়ন হয় না। উচ্চতর ডিগ্রিগুলো নামের আগে শুধু শোভাবর্ধন করে। কোনো সরকারি কলেজ থেকেই বিষয়ভিত্তিক উঁচু মানের গবেষণা জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। পাঠ্য বইয়ের স্বল্পতার কথা সর্বজনবিদিত। এমএ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী গাইড বই, নোট বই নির্ভরশীল। কলেজগুলোর সেমিনার রুম, লাইব্রেরি এবং শিক্ষকদের টেবিলের ওপর এসব নোট বই ও গাইড বই শোভাবর্ধন করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের ধরন এমন হয় যে কয়েক বছরের প্রশ্ন দেখে পড়লেই পাস নম্বর জুটে যায়, এমনকি প্রথম শ্রেণিও পাওয়া যায়। নোট বই ও গাইড বইগুলো ভুলে ভর্তি। ফলে ভুল শিখে একজন শিক্ষার্থী পরবর্তী জীবনে ভুল লিখবে, ভুল পড়াবে—এটাই স্বভাবিক। তার ওপর রয়েছে শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবন। সবাই বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা বায়োটেকনোলজির সবাই বিসিএসের প্রস্তুতি নেয়। আমার এক সহকর্মী একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, বিসিএস বিভাগ খুললেই হয়?

বিসিএস যদি জীবনের একমাত্র অর্জন হয়, তাহলে একজন শিক্ষার্থী কেন ইতিহাস, দর্শন কিংবা গণিতের জটিল বিষয়গুলো অধ্যয়ন করবে? সরকারি কলেজে একজন শিক্ষার্থী ভুলে ভরা নোট বই ও গাইড বই পড়ে প্রথম শ্রেণি অর্জন করছে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীকে উঁচু মানের বই পড়তে হচ্ছে। কর্মজীবনে দুজনের মূল্যায়ন যখন একই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মনোযোগ পাঠ্য বই থেকে একটু দূরে সরে যায়। আমাদের এখানে এখনো সনাতন পদ্ধতিতে এমএ শ্রেণিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ফলে মুখস্থবিদ্যায় যে পারদর্শী তার ফল ভালো হয়। শিক্ষার্থী কতটুকু জানে কিংবা কতটুকু জটিল বিষয়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখে, তা দেখার কোনো পদ্ধতি নেই। টিউটরিয়াল মৌখিক পরীক্ষা এবং ইনকোর্স চালু রয়েছে। শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের জন্য এসব প্রদ্ধতি কি যথেষ্ট? ইউরোপ, আমেরিকা থেকে আমাদের যেসব সহকর্মী যে পদ্ধতিতে পড়ে এসেছেন, সেই পদ্ধতি কিছুটা অনুকরণ-অনুসরণ করলে শিক্ষার গুণগত মান কিছুটা হলেও বাড়বে। শিক্ষার মান নেমে গেছে বলে চিৎকার করলে মান বাড়বে না।

নব্বইয়ের দশকেও শিক্ষার্থীরা মফস্বলের কলেজ থেকে বিএ পাস করে এসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করত। আবার অনেকে কলেজ থেকে সম্মান শ্রেণি পাস করে এসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পিলু’, ‘কলু’ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আসে না। বর্তমান শিক্ষার্থীরা শব্দ দুটির সঙ্গে পরিচিত নয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ছাড়া আর খুব কম ক্ষেত্র আছে, যেখানে এমএ পাসের প্রয়োজন হয়। উচ্চতর জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। কোচিং সেন্টারে প্রথম শ্রেণি অর্জন করা গেলেও দক্ষতা যে অর্জন সম্ভব নয়, তা ভালো করেই বোঝা যায়। কোনো একক ব্যক্তির দ্বারা বাংলাদেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। এ জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজন। রাষ্ট্রকেই নির্ধারণ করতে হবে তার দক্ষ জনবল কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হবে। দুর্বৃত্তায়িত প্রতিষ্ঠানপ্রধান দিয়ে আর যা-ই হোক কখনো দক্ষ জনবল সৃষ্টি হয় না।

 
লেখক : ড. মো. আনিসুজ্জামান, সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

শারমিন সিদ্দিকা সোহাগীর কবিতা

শারমিন সিদ্দিকা সোহাগীর কবিতা

মোবাইল ফোনের কুফল : মোঃ শেখ সাদী

মোবাইল ফোনের কুফল : মোঃ শেখ সাদী

গণিত ভীতি ও প্রীতি

গণিত ভীতি ও প্রীতি