ঢাকা, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

গণিত ভীতি ও প্রীতি

মোঃ শেখ সাদী

২০২২-০৯-১৬ ০০:৪৮:১০ /


গণিত, এই নামটার সাথে  যেন ভীতি ও প্রীতি  একসঙ্গেই জড়িয়ে থাকে।যিনি গণিত বুঝেন, তাঁর জীবনটা যেমন ধন্য ঠিক তেমনি যিনি বুঝেননা,এই বিষয়টা অসহনীয় তাঁর জন্য। কেন এমন হয়?জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে পারদর্শী হয়েও কেন অনেকের মনে গণিত ভীতি কাজ করে?

গণিতের ভিতটা তৈরি হয়ে যায় বা তৈরি করতে হয় ছোট বেলা থেকেই।গণিতের মেধা আর যৌক্তিক বিশ্লেষণ বা লজিক্যাল এ্যানালাইসিস ক্ষমতাকে ছোট থেকেই চর্চা করার প্রয়োজন।শিশুকে ছোট বেলা থেকেই গণিতে উৎসাহিত করতে হবে এবং এক্ষেত্রে শুধু থিওরিটিক্যাল জ্ঞানের পরবর্তে হাতে কলমে বিভিন্ন গাণিতিক পরীক্ষা যদি তার সামনে করে দেখানো যায় তবে সে ধীরে ধীরে গণিত বিষয়টিতে আগ্রহী হবে।

আমরা যদি আশেপাশের শ্রেণি কক্ষের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো,একদল শিক্ষার্থী গণিতকে খুব মজা করে শিখছে।কিন্তু বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর কাছে গণিত একটি আতংকের নাম।গতানুগতিক পাঠদান,পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার তাগিদ ইত্যাদি বিষয়গুলো গণিতের মতো সহজ বিষয়কে শিক্ষার্থীদের সামনে “জুজু”র  ভয়ের মতো আতংক হিসেবে সামনে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু আমরা একটু এগিয়ে আসলেই আমাদের শিশুগুলোর এই ভয়কে দূর করতে পারবো।এজন্য পরিবার ও শিক্ষকগণের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।বিদ্যালয় গুলোতে প্রয়োজন বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন।

বর্তমান পাঠ্যক্রম অনুযায়ী,একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত গণিতের পাঠ বাধ্যতামূলক।এর পিছে গুরুতর কারণও আছে।গণিতের প্রাথমিক পাঠের ধারণা না থাকলে জীবনে চলার পথে পদে পদে ধাক্কা খেতে হয়।তাই এটা সবার জন্যই জরুরি।পরবর্তী পর্যায়ে শুধুমাত্র ইচ্ছুক ও গণিতে দক্ষতা সম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীরাই বিষয়টি অধ্যয়ন করবে এটাই স্বাভাবিক।একটি সাধারন মানুষের জীবন ধারণের জন্য  ব্যবহারিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে প্রাথমিক যোগ,বিয়োগ, গুণ, ভাগ ও জ্যামিতি বিষয় গুলির প্রয়োগ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। এই বিষয়গুলিকে বুঝার জন্য খুব মেধার প্রয়োজন নেই,তবে  অবশ্যই ছোট বেলা থেকেই সঠিক সময়ে পাঠ্যক্রমের মধ্যদিয়ে চর্চা করতে হবে।নিজের আয় -ব্যয়, সঞ্চয়ের হিসাব ,ব্যাংকের কাজ, রোজকার বাজার বা অন্যান্য কেনাকাটা ইত্যাদির জন্য গণিতের স্বাভাবিক জ্ঞান থাকা দরকার।আপনি নিজে হয়তো সুযোগ বা নির্দেশনার অভাবে সঠিকভাবে গণিতকে আয়ত্ত করতে পারেননি তাতে কী?আপনার সন্তানকে নিয়ে গণিতের বিভিন্ন ছোটখাটো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সংগে সংগে নিজেও গণিতকে ভালো বেসে ফেলুন।

তিনটি খালি গ্লাস নিন।এদের একটি বড় এবং দুটি ছোট।ছোট দুটি গ্লাসের প্রতিটিতে আলাদা সংখ্যক মার্বেল নিন।এবার গ্লাস দুটির মার্বেল গুলো বড় খালি গ্লাসটিতে রাখুন।ব্যাস হয়ে গেল যোগফল।অর্থাৎ বড় গ্লাসটিতে রাখা মার্বেল সংখ্যাই হলো যোগফল।অথবা মার্বেল রাখা গ্লাস দুটির যে কোন একটির মার্বেল অন্যটিতে রাখুন তাহলে যে গ্লাসে মার্বেল রাখা হলো সেই গ্লাসের মার্বেল সংখ্যাই হলো যোগফল।

এবার বড় গ্লাসের নির্দিষ্ট সংখ্যক মার্বেল থেকে ছোট যে কোন গ্লাসে কিছু মার্বেল রাখুন।তাহলে বড় গ্লাসে পড়ে থাকা মার্বেল সংখ্যাই হলো বিয়োগফল।

তিনটি গ্লাসের প্রত্যেকটিতে সমান সংখ্যক মার্বেল নিন,এবার সবগুলো মার্বেল আলাদা একটি বড় খালি পাত্রে রাখুন।হয়ে গেল গুণফল।অর্থাৎ পরের খালি পাত্রে রাখা মার্বেল সংখ্যাই গুণফল। প্রতি গ্লাসের মার্বেলের সংখ্যাকে গ্লাসের সংখ্যা দ্বারা গুণ করলে গুণফল পাওয়া যায়।

ভাগ শেখাতে চান?তাহলে গুণফল বের করার জন্য যে পরীক্ষাটা করলেন,সেই পরীক্ষার পর বড় পাত্রে আরও কিছু মার্বেল রাখুন।এবার সেই পাত্রের মার্বেলগুলো কয়েকটি গ্লাসের প্রত্যেকটিতে সমান সংখ্যক মার্বেল রাখুন।ব্যাস এবার প্রতি গ্লাসে যতগুলো মার্বেল আছে সেই সংখ্যাই হচ্ছে ভাগফল আর বড় পাত্রে যতগুলো মার্বেল পরে রইলো সেই সংখ্যাই হলো ভাগশেষ।

গণিত ভীতির কিছু লক্ষণ রয়েছে,যেমনঃ ১)গণিত নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব। ২)শ্রেণি কক্ষে পিছনে বসা। ৩)শ্রেণিকক্ষে অমনোযোগী। ৪) শ্রেণিতে পাঠে অংশ গ্রহণে অনিচ্ছা।

গণিত ভীতি দূর করার উপায়ঃ

১) কোনো শিক্ষার্থী গণিত না পারলে তাকে কোনো ভাবেই ছোট করা যাবে না।তাকে সবার সামনে ঠাট্টা-তামাশা করা যাবে না।প্রথমে ঐ শিক্ষার্থীকে  গণিতের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে।গণিতের প্রতি তার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে।

২)গণিত মুখস্ত করার কোনো বিষয় নয়।তবে সূত্র মুখস্ত করা যেতে পারে।অবশ্যই গণিত বুঝতে হবে,বুঝে নিয়ে গণিত চর্চার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।

৩)শুধুমাত্র পাঠ্যবই কেন্দ্রিক না করে ধাঁধা,কুইজ,সুডোকু,পুলসাইড,পাজল,দাবা,বোর্ড গেম,রুবিক্স কিউব বা গণিতের নানা খেলার সাথে যুক্ত করা যেতে পারে।এসব খেলা মস্তিস্কের কর্ম ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।

৪) বিভিন্ন ছবি,ইলাস্ট্রেশন,এনিমেসনের মাধ্যমে গণিত শেখাটা অনেকটাই সহজ হতে পারে।

৫) গণিত নিয়ে অনেক মজার মজার বই রয়েছে ,অনলাইন প্রবন্ধ রয়েছে,সেগুলো পড়া যেতে পারে।

৬)বাস্তব জীবনের সাথে মিল রেখে যদি গণিত শেখানো হয়,সেটা বেশি মনে থাকে।

৭) শুরুতে গণিতের জন্য সময় নির্দিষ্ট করে না দিয়ে নিজের মত লম্বা সময় ধরে শিখতে উৎসাহিত করুন।

৮)সব চেয়ে ভালো হয়, অল্প কয়েকটা সহজ সমস্যা দিয়ে শুরু করা।এতে আগ্রহ বাড়বে।

৯)অনেকে সমস্যা সমাধান করার আগেই উত্তর পত্র দেখে নেন।এটা অনেকটা নিজেকে ঠকানোর মত কাজ। উত্তর না দেখে আগে যাচাই করুন।ভুল থেকেই শেখা হবে।

১০) নামতার হিসাব কিভাবে হলো বা এলো এগুলো যাচাই করলে,মনে রাখা সহজ হবে।

১১) সব সময় ক্যালকুলেটর বা গুগল নির্ভর না হয়ে ,ছোট খাট হিসাব মাথায় সেরে নেয়ার চেষ্টা করুন।

১২) গণিতের ভীতি দূর করার  কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত অনুশীলন।প্রতিদিন অল্প করে হলেও গণিত চর্চা করার অভ্যাস করলে আস্তে আস্তে এতে পারদর্শী হওয়া সম্ভব।

১৩)উপকরণ ব্যবহার করে আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীর শিখন হবে ভীতিহীন  ও দীর্ঘস্থায়ী।বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলিতে সরকার গণিত অলিম্পিয়াড কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে গণিত পাঠদানের উদ্যোগ নিলেও সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

১৪) গণিতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহায়ক হলেন, একজন ভালো শিক্ষক। এছাড়া যাঁদের গণিতে আগ্রহ আছে,তাঁরা অন্যদের ভীতি দূর করতে এগিয়ে আসতে পারেন।

গণিতের ভীতি কাটাতে সব শিক্ষার্থীর ক্লাসে মন খুলে কথা বলা বা প্রশ্ন করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।গণিত ভীতিতে থাকা শিক্ষার্থীরা অন্যদের সামনে ছোট হওয়ার ভয়ে থাকে এবং কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে না।

ভুল করাটা শিখন প্রক্রিয়ার একটি অংশ। শিক্ষকদের এই বিষয়টি বুঝানো বেশ গুরুত্বপুর্ণ।

লেখকঃ প্রধান শিক্ষক,বিন্নিবাড়ী সঃ প্রাঃবিদ্যালয় নালিতাবাড়ী,শেরপুর।

 

 

 

 

 

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

শারমিন সিদ্দিকা সোহাগীর কবিতা

শারমিন সিদ্দিকা সোহাগীর কবিতা

মোবাইল ফোনের কুফল : মোঃ শেখ সাদী

মোবাইল ফোনের কুফল : মোঃ শেখ সাদী

গণিত ভীতি ও প্রীতি

গণিত ভীতি ও প্রীতি